
কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লা মহানগরীর নামকরা প্রতিষ্ঠান শিক্ষাবোর্ড সরকারি মডেল কলেজের অধ্যক্ষ ড. একেএম এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে ভুয়া কমিটি দেখিয়ে ভর্তি বাণিজ্য, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষক-কর্মচারীদের সাথে অশোভন আচরণসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের এডহক নিয়োগের পর বেতন নির্ধারণের সময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে না পেয়ে নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১৫ শিক্ষকের বেতন বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের একটি মামলা হাইকোর্টে চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় অধ্যক্ষ-শিক্ষকদের দ্বন্দ্বে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নির্ধারিত আসনের অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি।
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৭ সালে সরকারিকরণকৃত কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড সরকারি মডেল কলেজে ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন এমদাদুল হক। তার যোগদানের পর থেকেই এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্যের বিষয়টি প্রতিবছর আলোচিত হয়ে আসছে। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে এবং এ নিয়ে স্থানীয় পত্র পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে সম্প্রতি নগরীর শাকতলা এলাকার সুলেমান আহমেদ নামের একজন অভিভাবক সদর আসনের এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের নিকট ভর্তি বাণিজ্যের বিষয়ে অভিযোগ করলে তিনি তা তদন্তের জন্য শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের নিকট প্রেরণ করেন। শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ গত ১৯ ডিসেম্বর কলেজ পরিদর্শক জহিরুল ইসলাম পাটোয়ারীকে আহবায়ক করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি গত ১০ জানুয়ারি ৯ পাতার একটি প্রতিবেদন বোর্ডের চেয়ারম্যানের নিকট দাখিল করেন। সোমবার ওই প্রতিবেদনের কপি স্থানীয় এমপি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হয়। কমিটির দাখিলকৃত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ শিক্ষাবর্ষে ৬ষ্ঠ, ৮ম ও ৯ম শ্রেণিতে (বিজ্ঞান) মোট ১৮ জন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে অধ্যক্ষ ভুয়া দৈনিক হাজিরা শিট তৈরি করে তদন্ত কমিটির নিকট সরবরাহ করেন। শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘কলেজে তদন্ত চলাকালে অধ্যক্ষের দাম্ভিকতাপূর্ণ রূঢ় ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ একজন সরকারী কর্মকর্তার আচরণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।’ মন্তব্যে বলা হয়, ‘ভর্তি বিজ্ঞপ্তির বাইরে অতিরিক্ত ভর্তির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি গোপন করার উদ্দেশ্যে অধ্যক্ষ মিথ্যা ডকুমেন্ট প্রস্তুত করে তদন্ত কমিটিকে সরবরাহ করেছেন। এমতাবস্থায় বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’
ভর্তি দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে অধ্যক্ষ ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, অতিরিক্ত ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের তথ্য যেন ফাঁস না হয় সে উদ্দেশ্যে অধ্যক্ষ পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুত এবং দৈনন্দিন হাজিরার কাজে ব্যবহৃত এডুমেন সফটওয়্যারে শিক্ষকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেন এবং বিগত বার্ষিক পরীক্ষার কমিটির অগোচরে ২০২১ সালের বার্ষিক পরীক্ষার সকল কাগজপত্র নিজের কব্জায় নিয়ে নেন। একই উদ্দেশ্যে তিনি কলেজ ওয়েবসাইট থেকে স্কুল শাখার শিক্ষার্থী তালিকা সম্পূর্ণরূপে মূছে ফেলেন। তদন্ত প্রতিবেদন সুত্রে আরো জানা যায়, ২০২১ শিক্ষাবর্ষে স্কুলশাখার ভর্তি কমিটির আহবায়ক ছিলেন নার্গিস আফরোজ (প্রভাষক, অর্থনীতি), সদস্য ছিলেন রহমত উল্লাহ (প্রভাষক, ইংরেজি) এবং সাইফুর রহমান (প্রভাষক, রসায়ন)। কিন্তু তদন্ত কমিটি তদন্ত কাজে কলেজে গেলে অধ্যক্ষ তার অপকর্ম ঢাকার হীন উদ্দেশ্যে প্রকৃত ভর্তি কমিটিকে আড়াল করে তার আস্থাভাজন তিন জনকে (বাংলার প্রভাষক ফাহিমা আক্তার, জীববিজ্ঞানের প্রদর্শক জগলুল হাসান এবং করনিক আলী মর্তুজা) দিয়ে একটি ভুয়া কমিটি গঠন করে তদন্ত কমিটির সামনে হাজির করান। ভুয়া ভর্তি কমিটির এই তিন সদস্য তদন্ত কমিটির নিকট লিখিত স্বাক্ষ্যে অধ্যক্ষ কোন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করাননি এবং ভর্তিতে কোন অনিয়ম হয়নি বলে জানান। তবে, তদন্তে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং তাদের মিথ্যা স্বাক্ষীর বিষয়টি ধরা পড়ে। ভুয়া ভর্তি কমিটির এই তিন জন ছাড়াও শরীরচর্চা শিক্ষক জি এম ফারুক বাবলুর বিরুদ্ধে অধ্যক্ষের সকল অনিয়ম ও অপকর্মে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে কলেজের ২৪ জন শিক্ষকের মধ্যে ২০ জন শিক্ষকের স্বাক্ষরিত ৪ দফার একটি অভিযোগ গত ১৯ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন দফতরে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। এতে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, শিক্ষক হয়রানি, স্কুল শাখায় ভর্তি বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগ আনা হয়। কলেজের গনিত বিভাগের প্রভাষক কাজি মোহাম্মদ ফারুক জানান, “অধ্যক্ষ কলেজে সর্বদা হয়রানি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রাখেন। কেউ গঠনমূলক কোন প্রস্তাব দিলে তিনি তাকে নানাভাবে অপমান ও অপদস্ত করেন। নারী সহকর্মীদের বিনা প্রয়োজনে অধ্যক্ষ অফিসে ডেকে পাঠান এবং ঘন্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে অপ্রয়োজনীয় ও অশোভন কথা বলেন। এতে কর্মস্থলে শিক্ষকদের বিব্রত হতে হচ্ছে।“
জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক দেবব্রত চক্রবর্তি জানান , বেতন বিষয়ে আমাদের রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট বেতন বন্ধ এবং টাকা ফেরতের চিঠির কার্যকারিতার উপর স্থগিতাদেশ দেয় ও রুল ইস্যু করে । অধ্যক্ষের অসত্য চিঠির কারনে দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পেয়ে আমরা কষ্টে আছি। এ সব অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড সরকারী মডেল কলেজের অধ্যক্ষ ড. একেএম এমদাদুল হক বলেন, বোর্ডের তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত নই। এ ছাড়া নারী শিক্ষকসহ ২০ জনের অভিযোগসহ অন্যান্য অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষ যে ব্যবস্থা নেন তা মেনে নেব। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোঃ আবদুছ সালাম জানান, শিক্ষা বোর্ড সরকারী মডেল কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জেনেছি। কলেজটির বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা নিজেরাও উদ্বিগ্ন। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ স্থানীয় সংসদ সদস্যের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আবদুস ছালামের দক্ষ নেতৃত্বে এবং পরবর্তী অধ্যক্ষ প্রফেসর রুহুল আমিন ভূইয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যেই কলেজটি কুমিল্লা জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বর্তমান অধ্যক্ষ ড একেএম এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিবছরই ভর্তি বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারীতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে চরম অশোভন আচরণ এবং শিক্ষক পরিষদ ও একাডেমিক কাউন্সিলের রেজুলেশন পরিবর্তনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। অধ্যক্ষের দাম্ভিকতা, ফেসবুকে মাত্রাতিরিক্ত প্রচারণা, ঘনঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং শিক্ষকদের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি করে সকল বিষয়ে একক সিদ্ধান্তের কারনে কলেজের শিক্ষার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি যোগ্যতা না থাকলেও বেছে বেছে শুধুমাত্র নারিদেরকেই খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়ায় শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অধ্যক্ষের নারী প্রীতি, মেয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে আপত্তিকর ঘনিষ্ঠতার আলোচনা এখন সবার মুখে মুখে। এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট সবার মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।


